তিপ্পুতে বেলাতেকাল্লেম (Tapputi-Belatekallim), পৃথিবীর প্রথম পার্ফিউমার হিসেবে খ্যাত একজন ব্যাবিলনীয় নারী। প্রায় ৪২০০ বছর আগে যার বসবাস ছিলো আসিরীয় সম্রাজ্যের নিনেভে অঞ্চলে (বর্তমান ইরাকের মাসুল), যা ছিলো মেসোপোটেমিয়ানদের এককালের রাজধানী আর ব্যাবিলনের কেন্দ্রবিন্দু, সুগন্ধীপ্রেমী এই নারীর ছিলো দারূন ঘ্রাণশক্তি, স্রেফ গন্ধ শুঁকেই তিনি পার্থক্য করতে পারতেন কার কাপড় কোনটা, কার বাসন কোসন কোনটা এবং তিনি ছিলেন প্রাচীন রসায়ন বিদ্যায় পারদর্শী। তার রসায়নের জ্ঞান আর সুঘ্রাণের প্রতি প্রেম তাকে পরিচিত করিয়েছিলো পৃথিবীর প্রথম এন্সিয়েন্ট ডিস্টিলেশনের সাথে, যার দ্বারা তিনি প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি করতে পারতেন দারুন সব সুগন্ধি। আর মেসোপোটেমিয়ায় সুগন্ধিকে মানা হতো সবচেয়ে পবিত্র জিনিস। সুগন্ধিই সেই জিনিস যা দিয়ে তারা দেবতাদের আকৃষ্ট করতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করতো।
.
মেসোপটেমিয়ানরা সুগন্ধিকে প্রথমে ধর্মীয় ও আচারিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করত।
তারা বিশ্বাস করত যে, সুগন্ধি ধোঁয়া ও তেল দেবতাদের “আত্মাকে তুষ্ট” করে, আর ঘ্রাণের মাধ্যমে প্রার্থনা আকাশে পৌঁছে যায়। আর এতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যিনি তৈরি করতে পারেন তার স্তরটা মেসোপোটেমিয়ানদের মাঝে কোথায় থাকতে পারে চিন্তা করুন একবার, এজন্যই তো দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া তিপ্পুতে হয়ে ওঠেন তৎকালীন মেসোপোটেমিয়ার রাজ পুরোহিতদের গুরুমাতা, এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্তেও যাকে ঐশ্বরিক শক্তিপ্রাপ্ত দূত হিসেবে সম্মান করা হতো। কিন্তু এতো এতো বছর আগের এই পার্ফিউমার সম্পর্কে জানা গেল কিভাবে?
.
সাল ১৮৫০ এর দিকে অস্টেন হেনরি লেয়ার্ড (Austen Henry Layard),
একজন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ও অভিযাত্রী, নিনেভে- অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ খনন করেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রচুর কিউনিফর্ম ট্যাবলেট আবিষ্কৃত হয়, মূলত Ashurbanipal’s Library (আশুরবানিপালের রাজগ্রন্থাগার) থেকে,
যা মানব ইতিহাসের প্রথম সংগঠিত জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থাগার থেকে প্রায় ৩০,০০০টির বেশি মাটির ফলক উদ্ধার হয়,
যেগুলিতে মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার ধর্ম, চিকিৎসা, রসায়ন, গণিত ও দৈনন্দিন জীবনের তথ্য লেখা ছিল। তার মধ্যে একটি কিউনিফর্ম ট্যাবলেট ছিলো অদ্ভুত রহস্যেঘেরা, রসায়নের প্রাচীন জটিল তত্ত্বে ভরপূর৷ সেখানেই প্রথমবার নামটি পাওয়া যায় বেলাতেকাল্লেমের এবং তার পার্ফিউম রেসিপির।
.
একটি ফলকে তার তৈরি করা একধরনের সুগন্ধির রেসিপি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি ফুল, তেল, সাইপ্রাস, মেইর (myrrh), বালসাম এবং পানি ব্যবহার করেছিলেন, এবং এগুলোকে distillation ও filtration প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করে বের করে আনতেন সুগন্ধি এবং এটাই মানব ইতিহাসে সুগন্ধি প্রস্তুতের প্রথম রসায়নগত রেকর্ড, যা পরে পারফিউমারির আধুনিক কৌশলের ভিত্তি হয়ে ওঠে। আরো একটি ফলকে পাওয়া গিয়েছিলো যে প্রথমদিকে পার্ফিউমের ব্যবহার শুধু দেবতাদের জন্য বিশেষ হলেও সময়ের সাথে সাথে রাজপরিবার, পুরোহিত, এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণি নিজেরাও এই সুঘ্রাণ ব্যবহার করতে শুরু করে। বিশেষ করে দেহে, পোশাকে এবং রাজপ্রাসাদে।
.
কিন্তু এই কিউনিফর্মের পাঠোদ্ধার ছিলো বেশ কঠিন, তাই এর অর্থ আবিষ্কারে এগিয়ে আসেন ব্রিটিশ ভাষাবিদ ও অ্যাসিরিওলজিস্টরা (Assyriologists)।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, স্যার হেনরি রলিনসন (Sir Henry Rawlinson) তিনি ছিলেন কিউনিফর্ম লিপি পাঠোদ্ধারের পথিকৃৎ, এবং ১৮৫০-এর দশকে প্রথমবার সঠিকভাবে এই লিপি ডিকোড করেন। তাঁর কাজের মাধ্যমেই নিনেভে গ্রন্থাগারের ট্যাবলেটগুলির বিষয়বস্তু পড়া সম্ভব হয়। Tapputi-এর নাম এবং তাঁর “distillation of flowers, oils, and aromatics” সংক্রান্ত টেক্সট পড়ে শনাক্ত করেন এবং অন্যান্য কিউনিফর্ম থেকে তিপ্পুতের আরো কিছু ইতিহাসও উন্মোচিত হয় এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে অ্যাসিরিওলজিস্ট ও রসায়ন ইতিহাসবিদরা বিশেষত এরিক স্মিথ (Erik Schmidt), যিনি প্রাচীন রসায়নের ওপর গবেষণার জন্য বিখ্যাত, তিনি Tapputi কে বিশ্বের প্রথম “chemist-perfumer” হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
.
আর তখন কিন্তু পার্ফিউম এপ্লাই করা হতো ধুপের মাধ্যমে, ধুপদানিতে করে কারন per fumam কথাটির মানেই হচ্ছে ধোঁয়ার মাধ্যমে, এখনো ধুপের মাধ্যমে ঘ্রাণ নেয়া বেশ প্রচলিত৷ বাই দ্যা ওয়ে পার্ফিউমকে কিন্তু বিকশিত করেছিলো প্রাচীণ মিশরীয়রা। আর এতে ভ্যারাইটি যুক্ত করেছিলো ভারতীয়রা। যেমন ক্লিওপেট্রাকে বলা যায় পৃথিবীর প্রথম ডিজাইনার নিশ পার্ফিউম ইউজার, তিনি যেই পার্ফিউম ইউজ করতেন তা অন্য কারো ইউজ করার অনুমতি ছিলো না, তার এই পার্ফিউম ছিলো অয়েল বেইজড এবং এর নাম ছিলো ‘কাইপি’ যা তৈরি করা হতো ফ্রাঙ্কিনসেন্স, মধু, ওয়াইন, পাইন রেজিন, দারুচিনি, বালসামের মিশ্রণে। এমনকি তুতেনখামুনের মাকবারা থেকেও তার ব্যবহৃত পার্ফিউমের রেসিপির সন্ধ্যান পাওয়া গেছে, এছাড়াও প্রাচীণ মিশরে পার্ফিউম নিয়ে ছিলো দারুন রহস্যজনক বহু বিষয়।
.
পার্ফিউমারিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যজনক অধ্যায় বলা যায়। এন্সিয়েন্ট ডিস্টিলারি টেকনিক থেকে মডার্ণ পার্ফিউমারি ইঞ্জিনিয়ারিং এর রহস্য ম্লান হয়নি এতোটুকো, বরং এখন তো এটা কেমিস্ট্রি লেভেলে চলে গিয়ে আরো জটিল হয়েছে এবং মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে, এবং এই মহাসমুদ্রে না জেনে নামলে ডুবে মরা বাঞ্চনীয়৷ সেজন্যই পার্ফিউমারির পুরো একটা টাইমলাইন সিরিজ আকারে লিখার পরিকল্পনা করছি ইনশাআল্লাহ৷ পেইজে এবং গ্রুপে এড দিয়ে রাখুন, ইন ফিউচার এটাকে আলাদা পেইজে বা ব্লগে সংরক্ষণের প্ল্যানিং আছে আমার, বলতে পারেন কাজ চলছে। আর অথেকটিক পার্ফিউম অয়েল চাইলে সেন্টারা থেকে কেনাকাটা করতে পারেন।
NOTE: আর কেউ কার্টেসী ছাড়া কপি করবেন না, সকল লেখা Scentara কর্তৃক সংরক্ষিত, কেউ কার্টেসী ছাড়া কপি করলে যদি আমার নজরে আসে, তাহলে কপিরাইট ক্লেইম দিয়ে দিবো, পেইজ নষ্ট হয়ে যাবে৷ লেখালেখি একটা শিল্প এবং লেখকের কষ্টের ফসল, একে মূল্যায়ন করুন এবং চুরি করা থেকে বিরত থাকুন।
চলবে……….