আগর-আতর বাংলাদেশের অনন্য এক সম্ভাবনাময় শিল্প। সুগন্ধি ও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে আগর-আতরের চাহিদা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। এছাড়া এটা দিয়ে তৈরি হয় আকর্ষণীয় উপহারসামগ্রী বা ঘরসাজানোর পণ্য। শুধু বাংলাদেশ কিংবা এশিয়া মহাদেশ নয়, বিশ্বের একমাত্র আগর-আতরের রাজধানী বা স্থান হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর গ্রামটি। আগর-আতরের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই পরিচিত এই সুজানগর, যার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে পৃথিবীজুড়ে।
বাংলা অভিধানে আগর শব্দের অর্থ হচ্ছে উৎকৃষ্ট, প্রধান, শ্রেষ্ঠ অগুরু বা সুবাসিত সুগন্ধবিশিষ্ট কাঠ। মূলত আগর একটি গাছ। আর এই গাছ থেকেই তৈরি হয় আতর বা ওষুধের কাঁচামাল কিংবা দামি উপহারসামগ্রী। পূর্ণাঙ্গ একটি আগর গাছ ২০ থেকে ৩০ ফুট লম্বা হয়। এর শাখা-প্রশাখাও থাকে। কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সের একটি আগরগাছ থেকে আতর বা কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়। তবে গাছের বয়স যত বেশি হবে, আতরও তত ভালো পাওয়া যাবে। বছরের যে কোনো সময় আগর গাছের চারা রোপণ করা যায়।
তবে এখানকার মানুষ বর্ষাকালেই আগরের চারা বেশি রোপণ করে। আগর গাছ থেকেই আগরের বিচি সংগ্রহ করা হয় এবং তা থেকে চারা উৎপাদন করা যায়। ১২-১৪ বছরের আগর গাছেই আগরের বিচি পাওয়া যায়। এসব বিচি মাটিতে রোপণ করে সাত দিনের মাথায়ই প্রথমে অঙ্কুর এবং পরে আগর চারা উৎপন্ন হয়। এছাড়া এখন আগরের অনেক নার্সারি হয়েছে, সেখান থেকেও আগরের চারা সংগ্রহ করেন এখানকার অনেক আগরব্যবসায়ী। নার্সারিতে তিন থেকে পাঁচ ফুটের একটি গাছ বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়।
মোটামুটি ছয় থেকে আট বছরের একটি আগর গাছ বর্তমান বাজারে বিক্রি হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। আর এই আগর গাছটি বড় করতে আগরচাষির খরচ হয় গড়ে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। সুজানগরসহ বড়লেখায় আগরের বাগান রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ৫০০টি এবং আগরের নার্সারি আছে ২০ থেকে ২৫টি। এছাড়া এখানকার প্রতিটি বাড়ির আশপাশেও দেখা যাবে আগর গাছ। পূর্ণাঙ্গ একটি আগর গাছের গোড়ার প্রস্থ ২ ফুট থেকে শুরু করে ২০ ফুট পর্যন্তও হয়ে থাকে। ঘন আকারের এসব বাগান দেখে সুজানগরকে চিরসবুজ সম্পদের গ্রাম বলা যায়।
এ অঞ্চলের ছোট-বড় পাহাড়, জঙ্গল বা টিলায় আগর গাছ পাওয়া যায়। যদিও এখন অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে আগর গাছের বাগান বা চাষ করেন। এখানকার অনেকে আবার কেবল আগর গাছ চাষ এবং বিক্রিই করেন। তারা আগরকাঠ বা আতর সংগ্রহ করেন না। আগর গাছ যিনি শনাক্ত করেন, স্থানীয় ভাষায় তাকে ‘দৌড়াল’ বলে। এখানে এখনও মাঝে মধ্যে শতবর্ষের পুরনো আগর গাছও পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুভাবে আগরকাঠ সংগ্রহ করা যায়। প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করা আগর গাছ কেটে তার মধ্য থেকে এক ধরনের কালো জাতীয় কাঠ পাওয়া যায়, স্থানীয় ভাষায় এটাই আগরকাঠ বা মাল।
কালো এই আগরকাঠ কেজি হিসেবে বিক্রি হয় চড়া দামে। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি কালো আগরকাঠের দাম ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। বিদেশিরা কালো এই আগরকাঠ দিয়ে তৈরি করেন মহামূল্যবান দামি সুগন্ধি বা ওষুধ অথবা ঘরসাজানোর সামগ্রী। তবে প্রাকৃতিভাবে বড় হওয়া সব আগর গাছে মূল্যবান কালো আগরকাঠ পাওয়া যায় না। আর যেটা পাওয়া যায়, তার দাম এবং গুণগত মান একটু বেশি।






Reviews
There are no reviews yet.