“কিরে ভাই? গতবার নিলাম সাদা এইবার দিলেন হলুদ, কাহিনী কি?” অথবা “আচ্ছা ভাই! আমার অয়েলটা তো নীল ছিলো এখন একটু সবুজ সবুজ লাগতেছে কেন?” এই প্রশ্নগুলো বেশ কমন৷ কমন কারণ হচ্ছে পার্ফউম অয়েলের কালার চেঞ্জ হয়ে যাওয়াটাও বেশ কমন। এই কমননেসটা ইন্টারমিডিয়েটে যারা সাইন্সে পড়েছে স্পেশালি অর্গানিক কেমেস্ট্রিটা যারা ভালোভাবে বুঝে পড়েছে তারা খুব সহজেই ধরতে পারবে। সাইন্স না পড়ে থাকলে আমি বুঝায় দিচ্ছি, তবে চাই স্বভাবসুলভ সাইয়েন্টিফিক টার্ম আর জটিল ভাষাভুষা চলে আসবে কিছু করার নাই তবে এমনভাবেই এক্সপ্লেইন করবো যেন শেখার সাথে সাথে মজাও পান৷ ওকে?
.
ঘটনা হচ্ছে, পার্ফিউম অয়েল মূলত অনেকগুলো অ্যারোমাটিক মলিকিউলের সমষ্টি। এতে ন্যাচারাল এক্সট্র্যাক্ট, রেজিন, এসেনশিয়াল অয়েল এবং সলভেন্টসহ আরো কিছু ইনগ্রেডিয়ান্টস থাকে। যখন একটা পার্ফিউম অয়েল একদম নিউলি প্রডিউস করা হয় তখন এর ভেতরের ইনগ্রেডিয়েন্টস বা অ্যারোমাটিক মলিকিউলগুলো তুলনামূলকভাবে “fresh” এবং chemically stable অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ তখনও উল্লেখযোগ্য Oxidation, Polymerization বা Photo-degradation (টার্মসগুলো মনে রাখবেন) শুরুই হয়না, এজন্য নতুন অবস্থায় অধিকাংশ অ্যারোম্যাটিক কম্পাউণ্ডসগুলো তাদের অরিজিনাল স্ট্রাকচার ধরে রাখে, ফলে তারা দৃশ্যমান আলো খুব কম গ্রহন করে এবং ভেতরের তরলটি স্বচ্ছ বা ট্রান্সপারেন্ট দেখায়।
.
পার্ফিউম অয়েলের কালার চেঞ্জ হওয়ার মূল কারণই হচ্ছে Oxidation (অক্সিডাইজেশন) এরপর Photo-degradation, Polymerization, Volatilization, এবং Maceration-induced molecular interaction। পারফিউম অয়েলের ভেতরে থাকা অ্যারোমাটিক কম্পাউন্ড, টারপিন, অ্যালডিহাইড, এস্টার, রেজিন এবং ন্যাচারাল এসেনশিয়াল অয়েল যখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন দেখবেন এই সুগন্ধি যৌগ ধীরে ধীরে ভেঙে নতুন যৌগ তৈরি করে, যার ফলে রঙ হালকা থেকে গাঢ় অ্যাম্বার, বাদামি কিংবা কখনও লালচে হয়ে যেতে পারে। খেয়াল করে দেখবেন যেসব অয়েলে ভ্যানিলা, অ্যাম্বার, উডি, রেজিনাস, ওউদ, প্যাচুলি, টোব্যাকো, ল্যাবডানাম বা কিছু ফ্লোরাল নোটস বা সেন্ট প্রোফাইল থাকে এসব পারফিউমগুলো দ্রুতই ডার্ক হয়ে যায়, কারণ এদের মধ্যে থাকা ন্যাচারাল রেজিন ও ফেনলিক কম্পাউন্ড অক্সিডেশনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
.
আবার সিন্থেটিক কেমিক্যাল নোটসের দিকে যদি ফোকাস দেই তাহলে দেখবেন – লিমোনিন, লিনালুল, সিট্রাল বা ইউজেনলের মতো জিনিস ইউজড হয়েছে যেই সিন্থেটিক পার্ফিউম অয়েলে সেগুলোও দ্রুত ডার্ক হয় কারণ এর যৌগগুলো ধীরে ধীরে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সাইড, অ্যালডিহাইড বা কিটোন তৈরি করে। এই নতুন যৌগগুলোর রঙ মূল কম্পাউন্ডের তুলনায় গাঢ় হয়। এ কারণেই ভ্যানিলা, অ্যাম্বার, ওউদ, প্যাচুলি, টোব্যাকো বা রেজিনাস টাইপের নোটসমৃদ্ধ পারফিউম অয়েল দ্রুত ডার্ক হয়।
.
এরপর আসে Photo-degradation বা আলোক-প্রভাবিত রাসায়নিক ভাঙন। সূর্যের UV Radiation বা অতিবেগুনি রশ্মি পারফিউমের কিছু সংবেদনশীল অণুর Molecular Bond Cleavage ঘটায়। অর্থাৎ আলোর শক্তি অণুর রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেয় এবং এর ফলে নতুন ক্রোমোফোর (Chromophore) তৈরি হয়, যা দৃশ্যমান রঙকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে। এই কারণে সরাসরি সূর্যের আলো পায় এমন পারফিউম অয়েল দ্রুত হলুদ বা বাদামি হয়ে যায়। এবং নীল জিনিসও সবুজাভ হয়ে যেতে পারে।
.
সেজন্যই আমরা বলি যে, যেকোনো পার্ফিউমই নেয়ার পর ঠাণ্ডা এবং আলো পড়েনা এমন জায়গায় নিয়ে রাখবেন কারণ বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় যদি পারফিউম অয়েল সরাসরি রোদ, ঘরের অতিরিক্ত তাপ বা গাড়ির ভেতরে রাখা হয়, তাহলে এর রঙ ও গন্ধ দুইই দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। দেখবেন উচ্চমানের পারফিউম অয়েলগুলো UV-protected বা গাঢ় কাঁচের বোতলে সংরক্ষণ করা হয়। পুরো জিনিসটারে মূলত Arrhenius Principle দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তবে একটু বেশি ভার্সিটি লেভেলের জিনিস হয়ে যায় তাই স্কিপ করলাম তবে ব্যাপারটা বেশ মজার৷
.
গরমের পাশাপাশি আর্দ্রতাও কালার পালটে দেয়। যদিও অয়েলের সাথে পানি সরাসরি মিশে না, তবুও একটা বোতল বারবার খোলা হলে ভেতরে আর্দ্র বাতাস প্রবেশ করতে পারে এবং কিছু সংবেদনশীল উপাদানের রাসায়নিক স্থিতিশীলতা কমিয়েও দিতে পারে। বিশেষ করে সাইট্রাস টাইপের নোট যেমন বার্গামট, লেমন, অরেঞ্জ বা গ্রেপফ্রুট অয়েল খুব দ্রুত অক্সিডাইজ হয়। এ কারণে সাইট্রাস-হেভি পারফিউমের রঙ তুলনামূলক দ্রুত বদলায় এবং এর ফ্রেশনেসও কমে যেতে পারে এটা স্প্রের বেলাতেও হতে পারে। এটারে মূলত moisture-assisted oxidation বলে৷
.
তবে একটা মজার ব্যাপার বলি পারফিউম অয়েলের রঙ পরিবর্তনের আরেকটি কারণ হলো ব্যবহৃত কাঁচামালের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ন্যাচারাল এসেনশিয়াল অয়েল ও অ্যাবসোলিউট কখনওই পুরোপুরি কালার-স্টেবল না। যদি কোনো পার্ফিউম অয়েলের কালার চেঞ্জ হয়ে থাকে তাহলে বুঝবেন সেটাতে কিছু না কিছু ন্যাচারাল জিনিস আছে কারণ পুরোপুরি সিন্থেটিক বেসড পারফিউম সাধারণত দীর্ঘসময় একই রঙ ধরে রাখে, কারণ এগুলোর মলিকিউলার স্ট্রাকচার তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল। Polymerization এর কারণে যে ন্যাচারাল রেজিন ও বালসামিক উপাদানগুলোতে সময়ের সাথে ছোট ছোট মলিকিউল একত্রিত হয়ে বড় মলিকিউলার স্ট্রাকচার তৈরি করে বেশি আলো শোষণ করে কালার শিফটিং শুরু হয়, সিন্থেটিকে সেই চান্স কম৷
.
আর Gracefull aging এর ব্যাপার তো আছেই৷ আপনি যখন আপনার পার্ফিউমকে রিচ আর স্মুথ বানানোর জন্য লং টাইম ধরে ম্যাসারেশন করতেছেন তখনও molecular blending এর কারণে রঙ পরিবর্তন হতে পারে। যদিও এটা আরো ভালো। মূলত রং পরিবর্তন হওয়া না হওয়া কোনো ব্যাপারই না কিছুক্ষেত্রে বরং বেটার যদিও রং পরিবর্তন ধীর করার জন্য পারফিউম ইন্ডাস্ট্রিতে Antioxidants ও UV Stabilizers ব্যবহার করা হয়। যেমন BHT (Butylated Hydroxytoluene), Tocopherol derivatives (Vitamin E), কিংবা certain chelating agents free radical formation কমিয়ে oxidation ধীর করে। তবে রং আসলে জরুরি কিছু না, তবে পার্ফিউম যা-ই কেনেন নেয়ার পর ঠাণ্ডা এবং আলো পড়েনা এসব জায়গায় রাখবেন তাহলে অনেকবছর ভালো থাকবে৷